ষাট গম্বুজ মসজিদ – বাগেরহাট

সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের (১৪৩৫-১৪৫৯) শাসনামলে খান আল-আজম উলুগ খানজাহান সুন্দরবনের ঘেঁষে খলিফাবাদ রাজ্য গড়ে তোলেন। খান জাহান সভা-সমাবেশের জন্য একটি দরবার হল নির্মাণ করেন, যা পরে ষাট গম্বুজ মসজিদে পরিণত হয়। এই মসজিদটি বহু বছর ধরে এবং প্রচুর ব্যয়ে নির্মিত হয়েছিল। পাথরগুলো রাজপ্রাসাদ থেকে নেওয়া হয়েছিল। তুঘলকি ও জৌনপুরীর স্থাপত্যশৈলী এতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

ষাট গম্বুজ মসজিদ বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি পুরাতন মসজিদ। মসজিদে কোন শিলালিপি নেই। তাই কে বা কারা এটি নির্মাণ করেছে সে সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য নেই। তবে মসজিদটির স্থাপত্য দেখে সন্দেহ নেই যে এটি খান-ই-জাহান নির্মাণ করেছিলেন। তিনি এটি ১৫শতকে নির্মাণ করেছিলেন বলে মনে করা হয়। এই মসজিদটি বহু বছর ধরে এবং প্রচুর ব্যয়ে নির্মিত হয়েছিল। পাথরগুলো রাজপ্রাসাদ থেকে নেওয়া হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের একটিতে অবস্থিত; খোদ বাগেরহাট শহর বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পেয়েছে। ইউনেস্কো ১৯৮৩ সালে এই সম্মান প্রদান করে।

মসজিদটি উত্তর থেকে দক্ষিণে বাইরের দিকে প্রায় ১৬০ ফুট লম্বা এবং ভিতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিম দিক থেকে বাইরের দিকে প্রায় ১০৪ ফুট এবং ভিতরের দিকে প্রায় ৮৮ ফুট। দেয়াল প্রায় ৮·৫ ফুট পুরু।

বাহ্যিক:

মসজিদের পূর্ব দেয়ালে ১১টি বড় খিলান দরজা রয়েছে। মাঝের দরজাটা অন্যগুলোর চেয়ে বড়। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে রয়েছে ৭টি করে দরজা। মসজিদের ৪ কোণে ৪ টি মিনার রয়েছে। এগুলি নকশায় গোলাকার এবং উপরের দিকে সরু । তাদের কার্নিশে বৃত্তাকার ব্যান্ড এবং শীর্ষে গোলাকার গম্বুজ রয়েছে। মিনারের উচ্চতা ছাদের চেয়ে বেশি। সামনের দুটি মিনারে প্যাঁচানো সিঁড়ি রয়েছে এবং এটি আজান দেবার জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। তাদের একটির নাম রওশন কোঠা। অন্যটির নাম আন্ধার কোঠা। মসজিদে ৬০টি স্তম্ভ রয়েছে। এগুলি উত্তর থেকে দক্ষিণে ৬ সারিতে সাজানো হয়েছে এবং প্রতিটি সারিতে ১০টি স্তম্ভ রয়েছে। প্রতিটি স্তম্ভ খোদাই করা পাথরের তৈরি, মাত্র ৫টি স্তম্ভ বাইরে থেকে ইট দিয়ে আবৃত।

এই ৬০টি স্তম্ভ এবং চারপাশের দেয়ালের উপর গম্বুজ তৈরি করা হয়েছে। মসজিদটির নাম ষাট গম্বুজ (৬০ গম্বুজ) মসজিদ, তবে এখানে গম্বুজের সংখ্যা ৬০ নয়, গম্বুজের সংখ্যা ৭৭। ৭৭টি গম্বুজের মধ্যে ৭০টি গোলাকার এবং সাতটি গম্বুজ মধ্যবর্তী সারিতে রয়েছে। পূর্ব দেয়ালের মাঝখানের দরজা এবং পশ্চিম দেয়ালের মাঝখানের মিহরাব বাংলাদেশের চৌচালা ঘরের চালের সাথে অনেকটা সাদৃশ্যপূর্ণ। মিনারের গম্বুজের সংখ্যা ৪টি, মোট গম্বুজের সংখ্যা ৮১টি। তবে এর নাম দেওয়া হয়েছিল ষাটগম্বুজ। ঐতিহাসিকরা ধারণা, সাতটি সারিবদ্ধ গম্বুজ সারি আছে বলেই এ মসজিদের নাম সাত গম্বুজ এবং তা থেকে ষাটগম্বুজ নাম হয়েছে। আবার, অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন যে গম্বুজগুলি ৬০টি পাথরের স্তম্ভের উপর অবস্থিত, তাই তাদের ষাটগম্বুজ নাম দেওয়া হয়েছিল।

অভ্যন্তরীণ:

মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে ১০টি মিহরাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় মিহরাবটি বড় এবং বিস্তৃত। এই মিহরাবের দক্ষিণে ৫টি এবং উত্তরে ৪টি মিহরাব রয়েছে। শুধুমাত্র উত্তর দিকের মাঝখানের মিহরাবের ঠিক পরে যেখানে ১টি মিহরাব থাকতে হবে সেটি হল ১টি ছোট দরজা। কারো কারো মতে, খান-ই-জাহান এই মসজিদটিকে নামাজের অনুষ্ঠান ছাড়াও দরবার ঘর হিসেবে ব্যবহার করতেন এবং এই দরজা ছিল দরবার বাড়ির প্রবেশদ্বার। আবার কেউ কেউ বলেন, মসজিদটি মাদ্রাসা হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।

কিভাবে যাবেন:

বাগেরহাট জেলা থেকে গাড়িতে করে ষাট গম্বুজ মসজিদ যাওয়া যায়।

Leave a Comment