মহেশখালী আদিনাথ মন্দির – কক্সবাজার

মহেশখালী আদিনাথ মন্দির ইতিহাস

সমুদ্র বেষ্টিত মহেশখালী আদিনাথ মন্দির অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

মহেশখালী আদিনাথ মন্দির ইতিহাস হতে জানা যায় যে আদিনাথের উৎপত্তি ত্রেতাযুগে কয়েক হাজার বছর আগে।

হিন্দু ধর্মগ্রন্থ, রামায়ণ, পুরাণ এবং ঐতিহাসিকদের কাছ থেকে জানা ঐতিহাসিক সত্যতা রয়েছে।

ত্রেতাযুগে রাম ও রাবণের যুদ্ধের কথা শাস্ত্রে পাওয়া যায়। রাবণ রামের সাথে যুদ্ধে জয়লাভের জন্য দেবাদিদেব মহাদেবের কাছে অমরত্বের বর প্রার্থনা করেছিলেন।

মহাদেব তখন কৈলাসে ধ্যানমগ্ন ছিলেন। রাবণের আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে, তিনি তাকে তার কাঙ্ক্ষিত সাধনার জন্য একটি বর দেন এবং আদেশ দেন যে ঊর্ধ্বমুখী শিবলিঙ্গটি কৈলাস থেকে লঙ্কায় নিয়ে যেতে হবে এবং রাস্তার কোথাও রাখা উচিত নয়।

রাখলে মহাদেব সেই স্থানেই থাকবেন এবং রাবণের ইচ্ছা পূরণ হবে না।

অধ্যাদেশ অনুসারে, রাবণ শিবলিঙ্গ নিয়ে লঙ্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন, কিন্তু পথে তিনি প্রাকৃতিক জন্য বর্তমান মহেশখালীর মৈনাক পর্বতে থামতে বাধ্য হন। পরে রাবণ শর্তানুযায়ী শিবলিঙ্গ পুনরুদ্ধার করতে ব্যর্থ হন এবং মহাদেব এই ময়নাক শিখরে তার বাসস্থান গ্রহণ করেন।

তিনটি অংশে বিভক্ত, প্রথম অংশে ৩.৩৫ বর্গ মিটার পরিমাপের দুটি পূজা কক্ষ রয়েছে।

পূর্ব কক্ষে একটি পুরুষ শিব মূর্তি এবং পশ্চিম ঘরে একটি অষ্টভুজাকৃতির দুর্গা প্রতিমা। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন যে শিবের সাথে মন্দিরটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

তারা বিশ্বাস করেন যে শিব রাবণকে কাঁধে নিয়ে কৈলাস পর্বত থেকে লঙ্কায় যাত্রা করার সময় কিছু সময়ের জন্য মৈনাক পাহাড়ে অবস্থান করেছিলেন।

বর্তমানে পাহাড়ের ক্রমাগত ভাঙনের ফলে মন্দিরের পূর্ব পাশের বিস্তীর্ণ জমি সামুদ্রিক প্রবালের আঘাতে বিলীন হয়ে গেছে। কক্সবাজার জেলা পরিষদ সম্প্রতি এই মন্দিরের পাশে আদিনাথ জেটি নির্মাণ করেছে, যা পর্যটকদের এখানে আসা সহজ করে দিয়েছে।

মহেশখালী আদিনাথ মন্দিরের আয়তন

আদিনাথ মন্দিরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৮৮ মিটার উপরে মাইনাক পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। মন্দিরের দৈর্ঘ্য ১০.৮৭ মিটার, প্রস্থ ৮.৬২মিটার, উচ্চতা ৫.৯৩মিটার।

মহেশখালী আদিনাথ মন্দির কখন প্রতিষ্ঠিত হয়

মন্দিরের তদারকি কমিটির পুস্তিকা থেকে আমরা জানতে পারি মহেশখালী আদিনাথ মন্দির কখন প্রতিষ্ঠিত হয় ।

জানা যায় যে দেওয়ান ব্রজ কিশোর লাল কানুনগোর প্রতিনিধি নবাব আলীবর্দী খান দেওয়ান কালীচরণের নয় বছর বয়সী বালক শরৎচন্দ্রের সাথে এই দ্বীপে এসেছিলেন।

দ্বীপ পরে শরৎচন্দ্র একজন নাগা সন্ন্যাসীর সংস্পর্শে আসেন এবং দীক্ষা নেন। তিনি ১৮৭৬ সালে তাঁর জমিদারির সমস্ত সম্পত্তি ঐশ্বরিক সম্পত্তি হিসাবে শ্রী শ্রী আদিনাথ মন্দিরের নামে দান করেন।

মহেশখালী আদিনাথ মন্দির কে প্রতিষ্ঠা করেন

তাছাড়া এলাকার প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী মহেশখালীর একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি নূর মোহাম্মদ সিকদার জানতে পারেন স্বপ্নে দেখা পাথরটি হিন্দুদের ‘দেব বিগ্রহ’।

এই দেবতার অনেক নামের মধ্যে ‘মহেশ’ ও ‘আদিনাথ’ নামগুলো অন্যতম। দেব বিগ্রহের নামানুসারে দ্বীপের নাম মহেশখালী এবং মণ্ডপের নাম ‘আদিনাথ মন্দির’ বলে ধারণা করা হয়। তবে এখানে প্রতি বছর এই মন্দিরকে ঘিরে শিব চতুর্দশীতে বাজারের আয়োজন করা হয়।

মহেশখালী আদিনাথ মন্দিরের উৎসব

শিব ভক্তদের প্রভাবে মহেশখালীতে প্রধান হিন্দু শারদীয় উৎসব পালিত হয় । মহেশখালী আদিনাথ মন্দিরের উৎসব এ উপলক্ষে মহেশখালীতে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থী ও পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে।

অনেক নারী-পুরুষকে প্রধান মন্দিরে পশু বলি দিতে দেখা যায় কারণ তারা সন্তান ধারণ করতে চায় বা তাদের সন্তানদের দীর্ঘায়ু কামনা করে। এই মুহূর্তে স্থানীয়রা সাধ্যমতো সনাতন ও রাখাইনের বাড়িতে আগত অতিথিদের আপ্যায়ন করতে ব্যস্ত। আদিনাথ মন্দির সংলগ্ন একটি প্রাচীন বৌদ্ধ প্যাগোডা ।

মহেশখালী আদিনাথ মন্দিরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

আদিনাথ মন্দিরের পাদদেশে রাখাইন সম্প্রদায়ের বসতি এবং ঠাকুরতলা বৌদ্ধ মঠ নামে একটি মঠ রয়েছে।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনীর নির্বিচারে বৌদ্ধ বিহারে গোলাবর্ষণে ৫ জন নিরীহ রাখাইন নির্যাতিত হয়।

পাকদের নৃশংস তান্ডবলীলার স্মারক হিসাবে কালের নীরব সাক্ষী হিসাবে শ্বেতপাথরে খোদাই করা এক জোড়া বুদ্ধ মূর্তি এখনও উক্ত বৌদ্ধ বিহারে বিদ্যমান রয়েছে।

আদিনাথ মন্দিরে আসা পর্যটকদের জন্য রাখাইন নারীরা সাময়িকভাবে স্টল বসিয়েছেন তাদের তৈরি কাপড়, চাদর বিক্রি করতে।

১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে, আদিনাথ মন্দিরের পশ্চিম দিকে অবস্থিত মুদিরছড়ার কাছে, একটি ব্রিটিশ মালিকানাধীন জাহাজ ‘এম.ভি ম্যালাড’ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কক্সবাজারে আসে এবং অনেক মানুষকে ডুবিয়ে দেয়। সেদিন আকাশ ছিল মেঘলা এবং গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি।

দুর্ভাগ্যজনক যাত্রীদের মধ্যে একজন ম্যাজিস্ট্রেট এবং তার আত্মীয়ও ছিলেন যাকে সবেমাত্র কক্সবাজার সাবসেকশনে বদলি করা হয়েছে। বিখ্যাত লেখক ও সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর বড় ভাই সৈয়দ মুস্তফা আলীর মেয়ে ছিলেন হতভাগ্য ম্যাজিস্ট্রেটের ভগ্নিপতি।

মহেশখালী আদিনাথ মন্দির কোথায় অবস্থিত

মন্দিরটি কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার গোরকঘাটা ইউনিয়নের ঠাকুরতলা গ্রামে অবস্থিত।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮৫.৩ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এই মন্দিরটি মৈনাক পাহাড়ের চূড়ায় নির্মিত, যেখানে সমতল থেকে ৬৯টি ধাপ উঠতে হয়। আদিনাথের আরেক নাম মহেশ। এই মহেশের নামানুসারে মহেশখালীর নামকরণ করা হয়েছে।

মহেশখালী আদিনাথ মন্দিরের পূজা

প্রতিদিন নিয়মানুযায়ী আদিনাথ, অষ্টভুজা, ভৈরব ও রাধাগোবিন্দ মন্দিরে একযোগে পূজা-অর্চনা করা হয়।

এছাড়া প্রতি বছর ফাল্গুনের শিব চতুর্দশী তিথিতে পূজা-অর্চনা ও দলীয় মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পূণ্যার্থীদের মনস্কামনা পূরণে মন্দিরের মাঠ ভরে যায়।

মন্দিরে রয়েছে বিরল প্রজাতির পারিজাত ফুলের চারা।

ভক্তরা গাছে একটি সুতো বেঁধে তাদের মনোবাসনা পূরণের জন্য ব্রত গ্রহণ করে এবং যখন ইচ্ছা পূরণ হয়, তারা সুতোটি খুলে পূজা দেয়।

মূল মন্দিরের পিছনে দুটি পুকুর রয়েছে। যদিও দুটি পুকুর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় 280 ফুট উচ্চতায় রয়েছে, তবে তাদের জল কখনই শুকায় না। জনশ্রুতি আছে যে এই ২টি  পুকুরে  যেকোন একটিতে স্নান করলে সমস্ত রোগ নিরাময় হয়।

মহেশখালী আদিনাথ মন্দিরের ব্যবস্থাপনা

মন্দিরের তদারকি কমিটির পুস্তিকা থেকে জানা যায় যে দেওয়ান ব্রজ কিশোর লাল কানুনগোর প্রতিনিধি নবাব আলীবর্দী খান দেওয়ান কালীচরণের নয় বছর বয়সী বালক শরৎচন্দ্রের সাথে এই দ্বীপে এসেছিলেন। দ্বীপ পরে শরৎচন্দ্র একজন নাগা সন্ন্যাসীর সংস্পর্শে আসেন এবং দীক্ষা নেন। তিনি ১৮৭৬ সালে তাঁর জমিদারির সমস্ত সম্পত্তি ঐশ্বরিক সম্পত্তি হিসাবে শ্রী শ্রী আদিনাথ মন্দিরের নামে দান করেন।

আদিনাথ দ্বৈত ব্যবস্থাপনা পুরী আইনের অধীনে মোহন্তান শাসনের অধীনে ছিল। পরে যখন মোহান্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়, তখন ১৯১১ সাল থেকে এর ব্যবস্থাপনা সীতাকুন্ড শ্রাইন কমিটির অধীনে ন্যস্ত করা হয়।

কিভাবে যাবেন

কস্তুরী ঘাট বা ৬নং ঘাট থেকে ট্রলার ও স্পিডবোটে করে মহেশখালী যাওয়া যায়।

কক্সবাজার জেলার ৬টি এলাকা। ট্রলারে প্রায় ১ ঘন্টা এবং স্পিডবোটে প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ট্রলার ও স্পিডবোট পাওয়া যায়।

তাছাড়া কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত চকরিয়া উপজেলা সদর থেকে ট্যাক্সি বা প্রাইভেট কারে মহেশখালী যাওয়া যায়।

মন্দিরে তীর্থযাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া মহেশখালীতে ভালো মানের হোটেল রয়েছে। তবে ভালো এলাকায় থাকতে চাইলে কক্সবাজার বা চকরিয়ায় থাকতে পারেন।

খাওয়ার ব্যবস্থা

আদিনাথ মন্দির থেকে নেমে আসলেই জেলে পাড়া।

জেলেদের জীবনধারার সাথে মিশে যাওয়ার একটি দুর্দান্ত সুযোগ রয়েছে। উপকূলে বিভিন্ন শামুক ও ঝিনুক দেখা যায়। প্রতিটি রেস্তোরাঁ কম দামে রূপচাঁদা বা কোরালের মতো সুস্বাদু সামুদ্রিক খাবার সরবরাহ করে। শুটকিও খাওয়া যায়।

মন্দিরে তীর্থযাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।

এ ছাড়া মহেশখালীতে ভালো মানের হোটেল রয়েছে। তবে ভালো এলাকায় থাকতে চাইলে কক্সবাজার বা চকরিয়ায় থাকতে পারেন।

মহেশখালী আদিনাথ মন্দির আবাসিক হোটেল

মহেশখালীতে রাত্রীযাপন সম্ভব। হোটেল সি গার্ডেন একটি ভালো হোটেল।

কক্সবাজারের কলাতলীতেও ভালো হোটেল আছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মোটেল শৈবাল, লাবণী, প্রবাল ছাড়াও বেসরকারি হোটেলগুলোর মধ্যে রয়েছে হোটেল সি গাল, মিডিয়া ইন্টারন্যাশনাল, হোটেল সি প্যালেস, জিয়া গেস্ট হাউস, সোহাগ গেস্ট হাউস, গ্রিন ভ্যাকেশন রিসোর্ট, নীট বেল রেস্ট হাউস। এই সব হোটেলে রাত কাটাতে পারবেন তিনশ থেকে তিন হাজার টাকায়।

উপসংহার

এখানে আসলে আপনি মহেশখালী আদিনাথ মন্দিরের ইতিহাস ও ঐতিয্য জানতে পারবেন।

কক্সবাজার দর্শনীয় স্থান

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত,

ইনানী বী,

মহেশখালী দ্বীপ,

সোনাদিয়া দ্বীপ,

হিমছড়ি,

রামু বৌদ্ধ বিহার,

রামু রাবার বাগান,

কুতুবদিয়া দ্বীপ,

মেরিন ড্রাইভ,

দরিয়া নগর,

সেন্টমার্টিন দ্বীপ ইত্যাদি।

আরও পড়ুন

Leave a Comment